উটের কুঁজ এবং নিউক্লিয়াস গুজব

গ্রামে বড় হলে কিছু কুসংস্কারকে নিয়ে বেড়ে উঠতে হয়। যেমনঃ
১। উটের পিঠের উঁচু কুঁজ আসলে শরীরের অংশ নয় এটি ইসলামধর্মের অতীতের কোনো নাম না জানা নবীর কবর
২। উটের কুঁজে পানি জমা থাকে। মরুভূমিতে চলাচলের তৃষ্ণা পেলে কুজ থেকে পানি গ্রহণ করে উট বেঁচে থাকে।
৩। সর্বশেষ গুজবটি হলো- উটের লোহিত কণিকায় নিউক্লিয়াস আছে। এটি এইসএসসি পর্যায়ের বায়োলজি বইতে দীর্ঘকাল লেখা ছিল।
 
ব্যাখ্যাঃ উটের পীঠের উঁচু কুঁজটি আসলে একটি চর্বির পিন্ড। আমরা জানি, শর্করা অপেক্ষা চর্বি দ্বিগুণ পরিমাণ শক্তি দেয়। উট যদি দীর্ঘসময় না খেয়ে থাকে কিংবা মরুভূমিতে হাঁটে তখন কুঁজের চর্বিগুলো ভাঙতে থাকে। ভেঙ্গে রক্তে চলে যায়। রক্ত থেকে শরীরের কোষে কোষে বন্টিত হয়। কোষের ভেতরে বিভিন্ন বিক্রিয়া শেষে চর্বি পরিণত হয় শক্তিতে (ATP)।
এজন্যই ক্ষুধার্ত উট এবং মরুভুমির পথে দীর্ঘসময় চলমান উটের কুঁজ ধীরেধীরে হেলে পড়ে কিংবা নিস্তেজ হয়ে খাটো হয়ে যায়। পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও খাদ্যগ্রহণ শেষে কুঁজটি আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসে।
মানুষের ক্ষেত্রেও চর্বি জমা থাকে। পর্যাপ্ত শক্তি না পেলে এসব চর্বি ভেঙ্গে মানুষের দেহ শক্তি উৎপন্ন করে। এসব চর্বি জমা থাকে- পেটে, কোমরের চারপাশে, বাটক এবং বুকে।
এবার প্রশ্ন হলো- কেন উটের চর্বি পেটের চারপাশে জমা থাকে না? কেন কুঁজে থাকে?
আমাদের পেটের চারপাশে চর্বি থাকার কারণে সামান্য গরমেই আমরা ঘেমে যায়। কিন্তু উটের কুঁজে চর্বি সঞ্চিত থাকার কারণে প্রখর রোদ, উত্তপ্ত মরুভূমিতে চলাচল করলেও উটের সহজে গরমবোধ হয় না। কারণ চর্বি ভাঙ্গার বিক্রিয়া কুঁজের কাছেই সীমাবদ্ধ থাকে। পুরো শরীর এতে অংশ নেয় না।
উটের কুঁজে আসলে পানি জমা থাকে না। উপরের লজিক থেকেই বুঝে ফেলার কথা। তাহলে উট ভ্রমণের আগে যে পানি খায় সেই পানি কোথায় যায়?
উট একবারেই ২০০ লিটার পর্যন্ত পানি খেতে পারে। ২০০ লিটার পানি খেতেও সময় লাগে মাত্র ৩ মিনিট। এরপর দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে পারে কোনো ধরণের পানি না খেয়েই। এই বিপুল পরিমাণ পানির কী ঘটে? কোথায় জমা থাকে?
সাহারা মরুভূমিতে উট শীতের ৬-৭ মাস কোনো ধরণের পানি না খেয়েই কাটিয়ে দেয়। তবে খাবার হিসেবে রসালো ধরণের ঝোপজাতীয় উদ্ভিদ খায়। (মরুভূমির উদ্ভিদসমুহ রসালো)। যদিও তা পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ করে না।
উট যখন একবারেই ২০০ লিটার পানি খায়, সেই পানি পরিপাকনালী থেকে হজম হয়ে চলে যায় রক্তে। মানুষের ক্ষেত্রেও তাই ঘটে। রক্তের আয়তন বেড়ে যায়।
মানুষের ক্ষেত্রে রক্তের আয়তন বাড়ার সাথেসাথে পূর্বের আয়তনকে ধ্রুব রাখতে অতিরিক্ত পানি মুত্র হিসেবে কিডনি দিয়ে দেহ থেকে বের হয়। কিন্তু উটের ক্ষেত্রে তা ঘটে না। যথেষ্ট সময় নেই। শুধু রক্তের আয়তনই বাড়ে না। রক্তের পানি লোহিত কণিকার ভেতরে প্রবেশ করে। ফলে লোহিত কণিকার আকৃতি স্ফীত হয়ে ডিম্বাকার হয়।
মানুষসহ সকল স্তন্যপায়ীর লোহিত কণিকা তৈরির পরপরই দ্বি-উত্তল থাকে। লোহিত কণিকার ভেতর থেকে নিউক্লিয়াস ও অন্যান্য অঙ্গাণু কিছুক্ষণের মধ্যেই বের হয়ে যায়। ফলে লোহিত কণিকার আঁকার চুপসে গিয়ে দ্বি-অবতল হয়ে যায়। দ্বি-অবতল হবার সুবিধা হলো- লোহিত কণিকার পৃষ্ঠতলের আয়তন বেড়ে যায়। লোহিত কণিকা তখন অধিক পরিমাণে অক্সিজেন বা কার্বন-ডাই-অক্সাইড শরীরে ধারণ করে, পরিবহন করতে পারে।
উটের লোহিত কণিকার ক্ষেত্রেও নিউক্লিয়াসসহ অন্যান্য অঙ্গাণু বের হয়ে যাবার ঘটনা ঘটে। কিন্তু উটের লোহিত কণিকা দ্বি-অবতল হয় না। ডিম্বাকারই থেকেই যায়। ডিম্বাকার থাকলে তারা প্লাজমার পাশাপাশি অতিরিক্ত পানি নিজেদের মধ্যেও ধারণ করতে পারে। এই পানি ধীরেধীরে কোষের বিক্রিয়ায় খরচ হতে থাকে।
মানুষের বা অন্যান্য স্তন্যপায়ীদের লোহিত কণিকায় নিউক্লিয়াস না থাকলে সুবিধা হলো- বেশি গ্যাসীয় পরিবহন করা যায়।
কিন্তু উটের লোহিত কণিকায় নিউক্লিয়াস না থাকার সুবিধা হলো দুইটি।
১। বেশি বেশি গ্যাসীয় পরিবহন করা যায়।
২। পানি সঞ্চিত রাখতে পারে।
331 Views